LandCare
ল্যান্ডকেয়ার সার্ভে এন্ড কনসালটিং, রাজশাহী

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মুসলিম উত্তরাধিকার এবং ফারায়েজ বণ্টনের একটি অকাট্য, পরিষ্কার এবং সহজবোধ্য আলোচনা

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মুসলিম উত্তরাধিকার এবং ফারায়েজ বণ্টনের একটি অকাট্য, পরিষ্কার এবং সহজবোধ্য আলোচনা

মুসলিম ফারায়েজ বা উত্তরাধিকার আইন ইসলামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ এবং মুসলিম পারিবারিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আমরা বাংলাদেশ মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-কে মাথায় রেখে শরিয়াহর আলোকে এই সেশনটি এগিয়ে নিয়ে যাব। এই অধ্যাদেশটি, বিশেষ করে এর ৪ নং ধারাটি, উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে, যা আমরা আলোচনার গভীরে গেলে বিস্তারিত জানব।

চলুন, এই জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শুরু করা যাক।


আমাদের সেশনের প্রথম ধাপ: ফারায়েজ বন্টনের পূর্বশর্ত

কোনো মুসলিম ব্যক্তি মারা যাওয়ার সাথে সাথেই তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি বন্টন করা যায় না। শরিয়াহ অনুযায়ী, সম্পত্তি বন্টনের আগে মৃত ব্যক্তির সম্পদ থেকে কিছু দায়-দেনা পরিশোধ করতে হয়। এই ধাপগুলো সম্পন্ন করার পরেই কেবল উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পদ বন্টিত হবে।

মৃত ব্যক্তির সম্পদ থেকে যা যা পরিশোধ করতে হবে (ধারাবাহিকভাবে):

১. দাফন-কাফনের ব্যয় নির্বাহ: মৃত ব্যক্তিকে সম্মানজনকভাবে দাফন করার জন্য প্রয়োজনীয় খরচ তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে সবার আগে মেটাতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো প্রকার অপচয় করা যাবে না, বরং শরিয়াহ সম্মত পন্থায় খরচ করতে হবে।

২. ঋণ পরিশোধ:
* বান্দার ঋণ: মৃত ব্যক্তি যদি কারো কাছ থেকে ঋণ নিয়ে থাকেন, তবে সেই ঋণ অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
* আল্লাহর ঋণ: যদি তার উপর যাকাত, কাফফারা বা মান্নত জাতীয় কোনো আর্থিক ইবাদত বাকি থাকে, তবে সেটাও পরিশোধ করা উত্তম।

৩. অসিয়ত (Will) পূরণ করা:
* মৃত ব্যক্তি যদি তার কোনো বৈধ অসিয়ত (উইল) করে যান, তবে তা পূরণ করতে হবে।
* শর্ত: অসিয়ত কেবল মাত্র অবশিষ্ট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) পর্যন্ত কার্যকর হবে। দাফন-কাফন ও ঋণ পরিশোধের পর যে সম্পত্তি থাকবে, তার তিন ভাগের এক ভাগ থেকে অসিয়ত পূরণ করতে হবে।
* আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো: কোনো উত্তরাধিকারীর নামে অসিয়ত করা যায় না। অর্থাৎ, যারা শরিয়াহ অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবেই অংশ পাবেন, তাদের নামে অসিয়ত করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না (যদি না অন্যান্য উত্তরাধিকারীরা সম্মতি দেন)।

এই তিনটি ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পর যে সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকবে, তাকেই "ترکہ" (তারাকা) বা উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি বলা হয়। এই "তারাকা" বা خالص সম্পত্তিই শরিয়াহ ও ১৯৬১ সালের আইন অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বন্টন করা হবে।

 

 

 

 

এই আলোচনাটি আইন, ধারা, মাসআলা এবং আদালতের প্রতিষ্ঠিত নীতিমালার উপর ভিত্তি করে তৈরি।

পর্ব ১: আইনের ভিত্তি (The Legal Foundation)

বাংলাদেশে মুসলিম উত্তরাধিকার আইন কোনো একক, কোডিফাইড আইন দ্বারা পরিচালিত হয় না। এর ভিত্তি হলো শরীয়াহ আইন, যা মূলত নিম্নোক্ত উৎস থেকে গৃহীত:

  1. The Muslim Personal Law (Shariat) Application Act, 1937: এই আইন অনুযায়ী, উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে মুসলমানরা তাদের নিজ নিজ মাযহাব দ্বারা পরিচালিত হবেন।

  2. হানাফী মাযহাব: বাংলাদেশের ৯৫% এর বেশি সুন্নি মুসলিম হানাফী মাযহাবের অনুসারী। তাই, বাংলাদেশের আদালত উত্তরাধিকার মামলা নিষ্পত্তির জন্য হানাফী ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থ (যেমন: হেদায়া, ফাতওয়া-ই-আলমগীরী) এবং এর উপর ভিত্তি করে লেখা আইনগ্রন্থ (যেমন: ডি.এফ. মোল্লার 'প্রিন্সিপালস অব মহামেডান ল')-কে আইন হিসেবে ব্যবহার করে।

  3. মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১: এটি একটি যুগান্তকারী আইন, যা ঐতিহ্যবাহী হানাফী আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিকে পরিবর্তন করেছে। এর ৪ নং ধারাটি বাংলাদেশে বিশেষভাবে প্রযোজ্য।


পর্ব ২: উত্তরাধিকারীর শ্রেণীবিভাগ (Classification of Heirs)

হানাফী আইন অনুযায়ী, রক্তের সম্পর্কের উত্তরাধিকারীদের প্রধানত তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয় এবং সম্পত্তি বণ্টনের সময় এই ক্রম কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়।

  1. যাবিল ফুরূয (ذَوُو الْفُرُوْض) বা নির্দিষ্ট অংশের অধিকারী (The Sharers):

    • এরা হলেন সেই সৌভাগ্যবান ১২ জন উত্তরাধিকারী, যাদের অংশ পবিত্র কুরআনে বা হাদীসে নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে (যেমন: ১/২, ১/৪, ১/৮, ২/৩, ১/৩, ১/৬)।

    • এরা সর্বাগ্রে সম্পত্তি পান।

    • মূল সদস্য: স্বামী/স্ত্রী, পিতা, মাতা, কন্যা, পুত্র, দাদা, দাদী, পূর্ণ বোন, বৈমাত্রেয় বোন এবং বৈপিত্রেয় ভাই-বোন।

  2. আসাবা (عَاصَبَة) বা অবশিষ্টভোগী (The Residuaries):

    • যাবিল ফুরূযদের নির্দিষ্ট অংশ দেওয়ার পর যে সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকে, তা আসাবারা পান।

    • যদি কোনো যাবিল ফুরূয না থাকেন, তবে আসাবারা সম্পূর্ণ সম্পত্তি পান।

    • এদের মূল ভিত্তি হলো পিতৃতান্ত্রিক সম্পর্ক।

    • মূল সদস্য: পুত্র, পুত্রের পুত্র (যত নিচে), পিতা, দাদা (যত উপরে), পূর্ণ ভাই, বৈমাত্রেয় ভাই, পূর্ণ চাচা, বৈমাত্রেয় চাচা এবং তাদের পুরুষ বংশধররা।

  3. যাবিল আরহাম (ذَوُو الْأَرْحَام) বা দূরবর্তী আত্মীয় (Distant Kindred):

    • যদি উপরের দুই শ্রেণীর (যাবিল ফুরূয ও আসাবা) কেউই জীবিত না থাকেন, শুধুমাত্র তখনই এই শ্রেণীর আত্মীয়রা সম্পত্তি পান।

    • মূল সদস্য: ফুফু, মামা, খালা, মেয়ের সন্তান (নাতি), বোনের সন্তান (ভাগ্নে) ইত্যাদি।


পর্ব ৩: সম্পত্তি বণ্টনের ধাপসমূহ (Step-by-Step Distribution Process)

বাংলাদেশের আইন ও প্রথা অনুযায়ী, একজন মুসলিম ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে পর্যায়ক্রমে নিম্নোক্ত ৪টি ধাপ অনুসরণ করা হয়:

  • ধাপ ১: দাফন-কাফনের খরচ: মৃতের সম্পূর্ণ সম্পত্তি থেকে তার দাফন-কাফনের আনুষঙ্গিক খরচ মেটানো হয়।

  • ধাপ ২: ঋণ পরিশোধ: দাফনের খরচের পর অবশিষ্ট সম্পত্তি থেকে মৃতের সকল প্রকার ঋণ (যদি থাকে) পরিশোধ করা হয়।

  • ধাপ ৩: ওসিয়ত (Will) কার্যকর: ঋণ পরিশোধের পর যা বাকি থাকে, তার সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) পর্যন্ত মৃতের কোনো ওসিয়ত বা উইল থাকলে তা কার্যকর করা হয় (তবে কোনো উত্তরাধিকারীর নামে উইল করা যায় না)।

  • ধাপ ৪: ফারায়েজ অনুযায়ী বণ্টন: উপরের সব ধাপ সম্পন্ন করার পর যে সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকবে, তা-ই ফারায়েজ আইন অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।


পর্ব ৪: গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও মাসআলা (Key Principles and Rulings)

১. বঞ্চনার নীতি (Principle of Exclusion):

  • "নিকটবর্তী উত্তরাধিকারী দূরবর্তীকে বঞ্চিত করে।" এটি ফারায়েজের মূল ভিত্তি।

  • উদাহরণ: পুত্র জীবিত থাকলে পুত্রের পুত্র (নাতি) বঞ্চিত হয়। পিতা জীবিত থাকলে দাদা বঞ্চিত হন। ভাই জীবিত থাকলে চাচা বঞ্চিত হন।

২. প্রতিনিধিত্বের নীতি ও তার ব্যতিক্রম (Doctrine of Representation & Its Exception):

  • ঐতিহ্যবাহী হানাফী আইন: এই আইনে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ নেই। অর্থাৎ, বাবা-মায়ের আগে কোনো সন্তান মারা গেলে, তার সন্তানরা দাদা-দাদীর সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হতো।

  • মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ (ধারা ৪): এই আইনটি বাংলাদেশে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

    • ধারা ৪-এর বিধান: উত্তরাধিকার শুরু হওয়ার আগে যদি কোনো পুত্র বা কন্যা মারা যান, তবে তার জীবিত সন্তানরা সম্মিলিতভাবে ঠিক ততটুকু অংশ পাবে, যতটুকু তাদের মৃত পিতা বা মাতা জীবিত থাকলে পেতেন।

    • এটিই বাংলাদেশে orphaned grandchildren বা এতিম নাতি-নাতনিদের অধিকারের মূল আইনগত ভিত্তি।

৩. রদ নীতি (Doctrine of Radd / الردّ):

  • যদি যাবিল ফুরূযদের অংশ দেওয়ার পর সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকে এবং কোনো আসাবা না থাকে, তখন সেই অবশিষ্ট সম্পত্তি স্বামী বা স্ত্রী ব্যতীত অন্যান্য যাবিল ফুরূযদের মধ্যে তাদের অংশ অনুযায়ী আনুপাতিক হারে আবার বণ্টন করে দেওয়া হয়।

৪. আউল নীতি (Doctrine of Aul / عول):

  • যদি যাবিল ফুরূযদের মোট অংশের যোগফল ১ (সম্পূর্ণ সম্পত্তি) এর চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখন সম্পত্তি না বাড়িয়ে প্রত্যেকের অংশ থেকে আনুপাতিক হারে কমানো হয়। অর্থাৎ, হর (denominator) বেড়ে যায় এবং লব (numerator) ঠিক থাকে।


পর্ব ৫: বাংলাদেশের আদালতের জন্য বিশেষ মাসআলা

দাদা বনাম ভাই-বোন (Grandfather vs. Siblings):

  • প্রশ্ন: দাদা কি ভাই-বোনকে বঞ্চিত করে?

  • বাংলাদেশের আইন: হ্যাঁ। যদিও হানাফী মাযহাবের ভেতরে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদের (সাহেবাইন) মতে দাদা ভাই-বোনদের সাথে অংশীদার হন, বাংলাদেশের আদালত ঐতিহ্যবাহী ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতকেই অনুসরণ করে। এই মতানুযায়ী, দাদা হুবহু বাবার মতো কাজ করেন এবং সকল প্রকার ভাই-বোনকে সম্পূর্ণরূপে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করেন। (রেফারেন্স: রাবেয়া খাতুন বনাম আজিজুর রহমান, ৫০ ডিএলআর)

আল-আকদারিয়্যাহ নীতি:

  • প্রশ্ন: এই নীতি কি বাংলাদেশে প্রযোজ্য?

  • উত্তর: না। এটি একটি বিশেষ পরিস্থিতি (স্বামী, মা, দাদা, বোন) সমাধানের জন্য মালিকী, শাফিঈ ও হাম্বলী মাযহাবের একটি নীতি। হানাফী মতে দাদা বোনকে সরাসরি বঞ্চিত করেন, তাই এই নীতির কোনো প্রয়োগ বা আলোচনা বাংলাদেশে নেই।


সারসংক্ষেপ: একটি সহজ গাইড

আপনার মূল উদ্দেশ্য যদি হয় কোনো একটি পরিস্থিতিতে কারা সম্পত্তি পাবে তা বের করা, তবে এই ক্রম অনুসরণ করুন:

  1. প্রথমেই দেখুন ৪ নং ধারার কোনো প্রয়োগ আছে কিনা (অর্থাৎ, কোনো এতিম নাতি-নাতনি আছে কিনা)। থাকলে তাদের অংশ আগে বের করে দিন।

  2. এরপর দেখুন মৃত ব্যক্তির স্বামী/স্ত্রী, পিতা/মাতা, পুত্র/কন্যা আছেন কিনা। এরা প্রায় সকল ক্ষেত্রেই সম্পত্তি পান।

  3. যদি পুত্র না থাকে, তাহলে দেখুন ভাই, ভাইপো বা চাচা আছেন কিনা।

  4. মনে রাখবেন:

    • পুত্র থাকলে ভাই, বোন, চাচা কেউ পাবে না।

    • পিতা থাকলে দাদা এবং ভাই-বোন (কিছু মতভেদ থাকলেও বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী) পাবে না।

    • যেকোনো ধরনের চাচা, যেকোনো ধরনের চাচাতো ভাইয়ের চেয়ে অগ্রাধিকার পান।

    • বৈপিত্রেয় চাচা বা ফুফু "আসাবা" নন, তারা "যাবিল আরহাম"।

       

       


       

এই আলোচনাটি বাংলাদেশের আদালতে প্রচলিত মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের একটি সামগ্রিক এবং পরিষ্কার চিত্র। যেকোনো নির্দিষ্ট ও জটিল পারিবারিক পরিস্থিতিতে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই সর্বোত্তম।

মন্তব্যসমূহ