উত্তরাধিকার আইন: মুসলিম সম্পত্তিতে ছেলে-মেয়ে, স্বামী-স্ত্রী কে কতটুকু অংশ পায়?
পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ আমাদের সমাজে একটি সাধারণ কিন্তু বেদনাদায়ক চিত্র। এর প্রধান কারণ হলো উত্তরাধিকার আইন বা ফরায়েজ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব। বাবার মৃত্যুর পর কোন সন্তান কতটুকু পাবে, স্ত্রী বা স্বামী কতটুকু পাবেন—এই হিসাবগুলো না জানার কারণেই ভাই-বোনের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট হয়, যা বছরের পর বছর মামলা-মোকদ্দমায় গড়ায়।
আপনার পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে আপনার অধিকার কতটুকু, তা জানা আপনার মৌলিক অধিকার।
এই পোস্টে আমরা মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টনের প্রাথমিক এবং সবচেয়ে জরুরি নিয়মগুলো সহজ ভাষায় তুলে ধরব, যাতে আপনি আপনার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন।
কারা সম্পত্তির অংশ পান? (প্রাথমিক উত্তরাধিকারী)
ইসলামিক আইন বা শরিয়াহ অনুযায়ী, একজন ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে কারা অংশ পাবেন, তা নির্দিষ্ট করা আছে। এদেরকে প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়:
অংশীদার (Quranic Sharers): কোরআনে নির্দিষ্ট করে দেওয়া ১২ জন ব্যক্তি, যাদের অংশ আগে থেকেই নির্ধারিত। যেমন—স্বামী, স্ত্রী, বাবা, মা, ছেলে, মেয়ে ইত্যাদি।
অবশিষ্টভোগী (Residuaries): অংশীদারদের দেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে, তা যারা পান। যেমন—ছেলে, ভাই, চাচা ইত্যাদি।
দূরবর্তী আত্মীয় (Distant Kindred): উপরের দুই শ্রেণির কেউ না থাকলে দূরবর্তী আত্মীয়রা সম্পত্তি পান।
এখন আমরা দেখব, সবচেয়ে সাধারণ পরিস্থিতিতে (বাবা, মা, স্বামী, স্ত্রী ও সন্তান জীবিত থাকলে) কে কতটুকু অংশ পান।
সাধারণ পরিস্থিতিতে সম্পত্তি বণ্টনের নিয়ম
👨⚖️ স্বামীর অংশ (মৃত ব্যক্তি যদি স্ত্রী হন):
মৃত স্ত্রীর কোনো সন্তান-সন্ততি থাকলে স্বামী পাবেন এক-চতুর্থাংশ (১/৪ অংশ)।
মৃত স্ত্রীর কোনো সন্তান-সন্ততি না থাকলে স্বামী পাবেন অর্ধেক (১/২ অংশ)।
👩⚖️ স্ত্রীর অংশ (মৃত ব্যক্তি যদি স্বামী হন):
মৃত স্বামীর কোনো সন্তান-সন্ততি থাকলে স্ত্রী পাবেন এক-অষ্টমাংশ (১/৮ অংশ)।
মৃত স্বামীর কোনো সন্তান-সন্ততি না থাকলে স্ত্রী পাবেন এক-চতুর্থাংশ (১/৪ অংশ)।
(একাধিক স্ত্রী থাকলেও সবাই মিলে ঐ ১/৮ বা ১/৪ অংশই সমানভাবে ভাগ করে নেবেন।)
👧👦 সন্তানদের অংশ:
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম: সন্তানরা (ছেলে-মেয়ে) অবশিষ্টভোগী হিসেবে সম্পত্তি পান। বণ্টনের নীতি হলো— ছেলে যা পাবে, মেয়ে তার অর্ধেক পাবে (২:১ অনুপাতে)।
যদি মৃত ব্যক্তির শুধু মেয়ে থাকে (কোনো ছেলে না থাকে):
একজন মেয়ে থাকলে সে মোট সম্পত্তির অর্ধেক (১/২ অংশ) পাবে।
একাধিক মেয়ে থাকলে তারা সবাই মিলে মোট সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩ অংশ) পাবে।
👴 বাবার অংশ:
মৃত ব্যক্তির কোনো পুত্র থাকলে বাবা পাবেন এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬ অংশ)।
মৃত ব্যক্তির শুধু কন্যা থাকলে বাবা এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬ অংশ) পাবেন এবং অংশীদারদের দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি থেকেও অংশ পাবেন।
👵 মায়ের অংশ:
মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান বা ভাই-বোন থাকলে মা পাবেন এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬ অংশ)।
মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান বা ভাই-বোন না থাকলে মা পাবেন এক-তৃতীয়াংশ (১/৩ অংশ)।
একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বুঝি
ধরুন, করিম সাহেব মারা গেলেন। তার মোট সম্পত্তি ৮০ শতাংশ জমি।
তিনি রেখে গেছেন:
১ জন স্ত্রী
২ জন ছেলে
১ জন মেয়ে
হিসাবটি কীভাবে হবে?
স্ত্রীর অংশ: যেহেতু সন্তান আছে, স্ত্রী পাবেন ১/৮ অংশ।
৮০ শতাংশের ১/৮ অংশ = ১০ শতাংশ।
অবশিষ্ট সম্পত্তি:
৮০ - ১০ = ৭০ শতাংশ। এই ৭০ শতাংশ জমি ২ ছেলে ও ১ মেয়ের মধ্যে ভাগ হবে।
ছেলে-মেয়ের মধ্যে বণ্টন (২:১ অনুপাতে):
এখানে ২ জন ছেলে = (২ x ২) = ৪ ভাগ।
এবং ১ জন মেয়ে = ১ ভাগ।
মোট ভাগ = ৪ + ১ = ৫ ভাগ।
অবশিষ্ট ৭০ শতাংশ জমিকে ৫ ভাগ করা হবে: ৭০ ÷ ৫ = ১৪ শতাংশ (প্রতি ভাগের মান)।
চূড়ান্ত বণ্টন:
প্রত্যেক ছেলে পাবে: ২ ভাগ x ১৪ শতাংশ = ২৮ শতাংশ করে। (মোট ২ ছেলে = ৫৬ শতাংশ)
মেয়ে পাবে: ১ ভাগ x ১৪ শতাংশ = ১৪ শতাংশ।
স্ত্রী পেয়েছেন: ১০ শতাংশ।
মোট: ৫৬ (ছেলেদের) + ১৪ (মেয়ের) + ১০ (স্ত্রীর) = ৮০ শতাংশ।
সম্পত্তি বণ্টনের জন্য প্রথম করণীয় কী?
উত্তরাধিকার সনদ (Succession Certificate) সংগ্রহ: ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভা/সিটি কর্পোরেশন থেকে মৃত ব্যক্তির সকল উত্তরাধিকারীর নাম উল্লেখ করে একটি সনদ নিতে হবে।
বণ্টননামা দলিল (Deed of Partition): সকল শরিক মিলে आपसी সম্মতিতে কোন অংশ কে পাবে, তা নির্ধারণ করে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে একটি বণ্টননামা দলিল রেজিস্ট্রি করতে হবে।
নামজারি: বণ্টননামা দলিলের ওপর ভিত্তি করে প্রত্যেক শরিককে নিজ নিজ নামে জমির নামজারি করে নিতে হবে।
শেষ কথা
উত্তরাধিকার আইন একটি জটিল বিষয়। এখানে অনেক সূক্ষ্ম নিয়মকানুন রয়েছে যা পরিস্থিতির সাথে বদলে যায়। এই পোস্টটি আপনাকে একটি প্রাথমিক ধারণা দেওয়ার জন্য।
যেকোনো পরিস্থিতিতে সম্পত্তি ভাগাভাগি করার আগে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী বা ভূমি বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করা অত্যাবশ্যক। সঠিক পরামর্শ আপনার পারিবারিক শান্তি বজায় রাখতে এবং আইনি জটিলতা এড়াতে সাহায্য করবে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন